নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষা মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) জিএম ফারহান ইস্তিয়াককে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার সুবিধা নেওয়া, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম ও হয়রানিতে ভূমিকা রাখা এবং বর্তমানে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সেই প্রভাব অব্যাহত রাখার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে সরকারি পদমর্যাদা ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।অভিযোগকারীরা বলছেন, বিষয়টি রাজনৈতিক বিরোধ বা ব্যক্তিগত আক্রোশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং একজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রশাসনিকভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা জরুরি। লিখিত আবেদনে অভিযোগকারীরা দাবি করেন, জিএম ফারহান ইস্তিয়াক বিগত সরকারের

সময়ের একজন সুবিধাভোগী ও বিতর্কিত ব্যক্তি হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তাদের অভিযোগ, তৎকালীন সংসদ সদস্য ফজলে করিমের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং ওই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকা অবস্থায় তিনি সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ও কঠোর আচরণ করতেন। এমনকি তার বিরুদ্ধে জুলুম, হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও জিএম ফারহান ইস্তিয়াক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে বহাল থাকায় তার প্রভাবের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রীর এপিএসের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার কারণে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তার যোগাযোগ ও প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা মনে করেন। তাদের অভিযোগ, সরকারি পদমর্যাদাকে ব্যবহার করে তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিভিন্ন বিষয়ে অদৃশ্য প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে তার অতীত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বর্তমান দায়িত্ব পালনের ধরনও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।লিখিত আবেদনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ১৮ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আচরণের বিষয়টি। অভিযোগকারীদের দাবি, শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক বিষয়ে সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার প্রত্যাশায় জিএম ফারহান ইস্তিয়াকের কাছে গেলে তিনি তাদের সঙ্গে তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ, অসংবেদনশীল ও অবমাননাকর আচরণ করেন। শিক্ষার্থীরা একাডেমিক সহায়তার জন্য একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার পর তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়ে থাকলে সেটি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তারা মনে করেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রতিও সহযোগিতামূলক ও দায়িত্বশীল থাকা। ফলে ওই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের বক্তব্য গ্রহণ করে তদন্ত করার দাবি উঠেছে।অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও জিএম ফারহান ইস্তিয়াকের বিরুদ্ধে পুরোনো রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের তদবির চালানোর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কারাবন্দী সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিমকে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ সুযোগ সুবিধা ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি গোপনে তদবির করছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির পক্ষে অবৈধ প্রভাব খাটানো বা তদবির করার অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ আছে কি না। তাদের মতে, সরকারি পদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম হতে পারে না। সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করা এবং কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা।লিখিত আবেদনে অভিযোগকারীরা জিএম ফারহান ইস্তিয়াকের অতীত রাজনৈতিক যোগাযোগ, বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড, তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সম্পর্ক, বর্তমান সরকারি দায়িত্বে তার ভূমিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তার প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে কোনো সরকারি নথি, যোগাযোগ, সুপারিশ, তদবির কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে।অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি অতীতে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছেন কি না, সেটি শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত নয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে যখন একাধিক গুরুতর অভিযোগ ওঠে এবং তিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন, তখন বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অংশ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের বিষয়টিও যথাযথভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন ও প্রশাসনিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। তারা চান, বর্তমান সময়ে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডে যেন কোনোভাবেই পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতি ফিরে না আসে। তাদের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি নিজের পদমর্যাদা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেন, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য নয়, সাধারণ মানুষের আস্থার জন্যও উদ্বেগের বিষয়।এদিকে অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, জিএম ফারহান ইস্তিয়াকের বিরুদ্ধে অতীতে যারা বিভিন্ন ধরনের হয়রানি বা জুলুমের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করছেন, তাদের বক্তব্যও তদন্তের সময় গ্রহণ করা প্রয়োজন। শুধু একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী, স্থানীয় বাসিন্দা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী এবং সরকারি নথিপত্র যাচাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসতে পারে। এতে অভিযোগের সত্যতা যেমন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, তেমনি মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত অভিযোগের বিষয়টিও পরিষ্কার হবে।
অভিযোগকারীরা মনে করেন, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা ক্ষমতার প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া, অভিযোগকারীদের বক্তব্য যাচাই করা এবং প্রাসঙ্গিক নথিপত্র পরীক্ষা করা হলে তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।লিখিত আবেদনে আরও বলা হয়েছে, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার কিংবা অবৈধ তদবিরের মতো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা প্রশাসনিকভাবে গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কারণ সরকারি পদে থাকা ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শুধু তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং সরকারের ভাবমূর্তিও জড়িত। ফলে অভিযোগের সত্যতা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জিএম ফারহান ইস্তিয়াকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাকে এপিএস পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়াসহ বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।এ বিষয়ে জানতে চেয়ে তার মুঠোফোনে একাধিকবার এই প্রতিবেদক যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও কোনরকমে যোগাযোগ করতে পারেননি।
তাদের আরও দাবি, কারাবন্দী সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিমকে অবৈধ সুযোগ সুবিধা দেওয়ার জন্য কথিত তদবিরের অভিযোগটি বিশেষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ ধরনের কোনো তদবির সত্যিই হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, কী ধরনের সুপারিশ বা প্রভাব প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে সরকারি পদমর্যাদার কোনো অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত বলে তারা মনে করেন।অভিযোগকারীরা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশা হলো প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। কোনো কর্মকর্তা বা সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তি যেন অতীতের রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত যোগাযোগ কিংবা ক্ষমতার দাপট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই জিএম ফারহান ইস্তিয়াককে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে দ্রুত তদন্ত শুরু হলে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে বলে তারা আশা করছেন।সবশেষে অভিযোগকারীদের আবেদন, বিষয়টি যেন কোনো রাজনৈতিক পক্ষের অভিযোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ হিসেবে বিষয়টি প্রশাসনিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হোক। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হোক। তাদের মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সরকারি পদকে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ কারও থাকা উচিত নয়। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে এবং তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেদিকেই নজর রয়েছে চট্টগ্রামবাসীর।