• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন
Headline
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করেও বহাল তবিয়তে আহসান হাবীব আনোয়ারা রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে প্রয়াত অ্যাড. হরিপদ চক্রবর্তীর স্মরণসভা অনুষ্ঠিত নজরুলজয়ন্তীতে শিল্পী রিষু তালুকদারের কণ্ঠে নজরুলসংগীতের স্বর্ণালি সন্ধ্যা মা হারানোর অব্যক্ত আর্তনাদ “মা, তোমাকে হারিয়ে আজ আমি সত্যিই এতিম” চট্টগ্ৰামের আদালতের নিষেধাজ্ঞা অবমাননার অভিযোগ লালদীঘিতে দুইটি আবাসিক হোটেলে পুলিশের হানা, কোতোয়ালি থানার অভিযানে ১০ নারী পুরুষ আটক। জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা চট্টগ্রাম মহানগরীর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত সিএমপি’র পাহাড়তলী থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ০১ জন কুখ্যাত ছিনতাইকারী গ্রেফতার রাউজান উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত সুমি সেন বই : জ্ঞান ও মেধার অমূল্য রত্ন

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করেও বহাল তবিয়তে আহসান হাবীব

Reporter Name / ৩৭ Time View
Update : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল, উন্নয়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে অনিয়ম ও দূর্নীতিতে সিণ্ডিকেট গড়ে তুলেছিলো বহিষ্কৃত নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া ও বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র বা ‘সিণ্ডিকেট’ বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এই সিণ্ডিকেটে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীবসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিণ্ডিকেটের প্রভাব গড়ে উঠেছিল, যেখানে টেন্ডার প্রক্রিয়া, কাজ বণ্টন, প্রকল্প অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির প্রভাব ছিল। এই প্রভাব বলয়ের কারণে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেয়েছে। দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যাতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান সহজেই অংশ নিতে পারে, অন্যদের জন্য প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে। যদিও এসব দাবি নিয়ে এখনো কোনো নিরপেক্ষ ও চূড়ান্ত সরকারি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
এদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) কাজী সালেহ মুস্তানজির বহিষ্কার করা হয়। কাজী সালেহ মুস্তানজির ও আহসান হাবীবের ছিলো খুব ভালো সম্পর্ক তারা তিন জন মিলেই সকল অনিয়ম করতো।
এই বিষয়ে কথা বলতে নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীবের কাছে গেলে তিনি বলে আপনাদের অভিযোগ দেয়ার দরকার নেই আপনারা আমার বাসায় চলুন। পরে আর কোন উত্তর না দিয়ে সাংবাদিকদের বিদায় দেন তিনি।
সম্প্রতি ডিএসসিসির একটি দপ্তর আদেশে নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়াকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মার্কেট পরিচালনা, দোকান বরাদ্দ, টেন্ডার কার্যক্রমসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু এই সিণ্ডিকেটের অন্য সদস্য ও মূলহোতা নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব পদোন্নতি পায়।
এই সিণ্ডিকেট শুধু টেন্ডার প্রক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল অনুমোদন, কাজের মান নির্ধারণ এবং অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াতেও এর প্রভাব ছিল। কিছু ক্ষেত্রে কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে, আবার কোথাও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
মো. আহসান হাবীব ২০২০ সালের পর থেকে ডিএসসিসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা যায়। তিনি অঞ্চলভিত্তিক নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি পরবর্তীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বর্জ্য অপসারণ সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠে।
এই সিণ্ডিকেটের বিরুদ্ধে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতকে কেন্দ্র করেও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। রাজধানীর দৈনন্দিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিষ্পত্তি ডিএসসিসির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অভিযোগকারীদের দাবি, এই খাতে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গাড়ির জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয় এবং লজিস্টিকস খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া লগবই ব্যবহার করে অতিরিক্ত ট্রিপ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে বলে দাবি করা হয়। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে শক্ত প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
এই খাতের আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জনবল ব্যবস্থাপনা। অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, মাস্টাররোল ও স্থায়ী কর্মীর তালিকার মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। কাগজে-কলমে দেখানো জনবল এবং বাস্তবে কর্মরত কর্মীর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। এছাড়া উপস্থিতি রেকর্ড, বেতন প্রদান এবং কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সরঞ্জাম ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। তাদের মতে, ডাস্টবিন, কনটেইনার, বর্জ্য পরিবহন যান এবং অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাজারদরের তুলনায় অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বা নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সরবরাহকারীদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব বিষয়ও এখনো তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল এবং সামগ্রিক বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম নিয়েও আলাদা করে প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হলেও কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তারা বলছেন, এই খাতে নিয়মিত অডিট ও কঠোর তদারকি না থাকলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সংবেদনশীল খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং স্বাধীন নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ডিএসসিসির আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) কাজী সালেহ মুস্তানজিরকে বহিষ্কার করা হয়। অভিযোগকারীদের মতে, তিনি এবং আহসান হাবীবের মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক সম্পর্ক ছিল এবং বিভিন্ন কার্যক্রমে তাদের সমন্বিত ভূমিকার অভিযোগ উঠেছে। তবে এই সম্পর্ক বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত সরকারি ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি।

অভিযোগকারীদের একটি অংশ দাবি করছে যে এই পুরো ব্যবস্থার ভেতরে একটি সমন্বিত প্রভাব বলয় কাজ করছিল, যেখানে কয়েকজন কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং প্রশাসনিক ব্যক্তি মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের মতে, এই কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা কমে যায় এবং ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা তৈরি হয়। তবে এসব দাবি এখনো অভিযোগ পর্যায়ের বাইরে প্রমাণিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
বর্তমানে গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলমান থাকলেও নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান কিভাবে পদোন্নতি পায় সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
একই সঙ্গে আহসান হাবীবসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও আলাদা পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। নাগরিক সমাজের একটি অংশ মনে করছে, পুরো প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব হয় এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।
এই পরিস্থিতিতে ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের অভিযোগ অনেকাংশে কমে আসতে পারে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সীমিত থাকলেও, তারা অতীতে বিভিন্ন সময়ে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায়। তবে সাম্প্রতিক অভিযোগ ও তদন্ত কার্যক্রমের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে ডিএসসিসির প্রকৌশল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা, পরিসর এবং দায় নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন বলে বিভিন্ন মহল থেকে মত দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জনসাধারণের প্রত্যাশা হলো, যেকোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগের সঠিক ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি হবে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও জোরদার করা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা