নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:
চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চাক্তাই-কালুরঘাট চার লেনের বাঁধ-কাম-মেরিন ড্রাইভ সড়কটির নির্মাণকাজ প্রায় ৯২ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ৯.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেগা প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে নির্মিত এই সড়কটি চালু হলে চট্টগ্রামের সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্যা ও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি:
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪.৫ ফুট উচ্চতায় নির্মিত এই সড়কটি মূলত একটি শক্তিশালী সুরক্ষা বাঁধ হিসেবে কাজ করবে। কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানি এবং জলোচ্ছ্বাস থেকে চট্টগ্রাম শহরকে রক্ষা করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া, শহরের বৃষ্টির পানি ও জোয়ারের পানি নিষ্কাশনের জন্য বিভিন্ন খালের মুখে ১২টি হাই-টাইড রেগুলেটর এবং পাম্প হাউস স্থাপন করা হচ্ছে, যা নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা দূর করতে বড় অবদান রাখবে। প্রায় ২,২৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
যোগাযোগ ও বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত:
এই মেরিন ড্রাইভটি চালু হলে তা চট্টগ্রাম শহরের একটি অন্যতম প্রধান ‘সিটি বাইপাস’ হিসেবে কাজ করবে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম (কক্সবাজার, বান্দরবান, পটিয়া) এবং কালুরঘাট শিল্প এলাকা থেকে আসা পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী যানবাহনগুলো শহরের মূল কেন্দ্রে (যেমন- বহদ্দারহাট, চকবাজার, জিইসি) না ঢুকে এই সড়ক দিয়ে সরাসরি যাতায়াত করতে পারবে। এতে শহরের ভেতরের তীব্র যানজট অনেকাংশে কমে আসবে। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাণিজ্যিক কেন্দ্র চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা এখন খুব সহজেই এবং কম সময়ে কালুরঘাট শিল্প এলাকা ও চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহন করতে পারবেন।
মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ:
প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এর পেছনে একাধিক বাস্তব কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। কালুরঘাট এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত আইনি জটিলতা ও মামলার কারণে দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ ছিল। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির অংশে সড়কের নকশা পরিবর্তন এবং রাস্তার অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করতে হওয়ায় প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ও কাজের পরিধি বৃদ্ধি পায়। প্রাথমিক নকশায় ওয়াকওয়ে ও বিনোদন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও পরবর্তীতে সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় ৫ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, পর্যটন অবকাঠামো এবং নদীতীর উন্নয়ন কার্যক্রম যুক্ত করা হয়। এর ফলে প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গুণগত মানে কঠোর নজরদারি:
সিডিএ জানিয়েছে, প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমা যৌক্তিক কারণে বৃদ্ধি পেলেও নির্মাণকাজের গুণগত মানের সঙ্গে কোনো আপস করা হয়নি। প্রকল্পে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রী নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর পরীক্ষাগারে ল্যাব টেস্ট সম্পন্ন হওয়ার পরই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে।
উচ্ছ্বসিত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা:
প্রকল্পটি নিয়ে খাতুনগঞ্জের প্রবীণ ব্যবসায়ী আলহাজ্ব মোস্তফা হাকিম বলেন, “চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের পণ্য পরিবহনে দীর্ঘদিনের বড় বাধা ছিল শহরের ভেতরের যানজট। এই মেরিন ড্রাইভ চালু হলে পণ্যবাহী ট্রাক সরাসরি বহদ্দারহাট এড়িয়ে বন্দরে যেতে পারবে। এতে আমাদের সময় ও খরচ দুই-ই বাঁচবে।” অন্যদিকে বাকলিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “একসময় জোয়ারের পানিতে আমাদের ঘরবাড়ি ডুবে যেত। এই বাঁধের কারণে আমরা এখন বন্যার হাত থেকে বাঁচব, পাশাপাশি আমাদের এলাকায় এত সুন্দর একটা রাস্তা হবে তা কখনো ভাবিনি।”বাকলিয়াকেন্দ্রিক নতুন পর্যটন সম্ভাবনা:প্রকল্পের আওতায় অবহেলিত বাকলিয়া অঞ্চলকে একটি আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করা হচ্ছে। শাহ আমানত সেতু থেকে বলিরহাট পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন পর্যটন জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চাক্তাইয়ের কল্পলোক আবাসিক এলাকা থেকে বলিরহাট পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে। সিডিএ-র পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই পর্যটন জোনে থাকবে আধুনিক ফ্যামিলি রেস্টুরেন্ট, শিশুদের বিনোদনের জন্য রাইডসমৃদ্ধ বিশেষ জোন, বসার স্থান এবং দৃষ্টিনন্দন সবুজায়ন। কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও এখন থেকেই প্রতিদিন বিকেলে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা কর্ণফুলী নদীর মনোরম সৌন্দর্য উপভোগ করতে এই মেরিন ড্রাইভে ভিড় জমাচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে সিডিএ-র প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, “প্রকল্পের মূল সড়ক ও বাঁধের কাজ প্রায় শেষ। বর্তমানে ফিনিশিং কাজ এবং রেগুলেটরগুলোর কিছু কারিগরি কাজ বাকি রয়েছে, যা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সড়কটি পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।” সিডিএ কর্তৃপক্ষের আশা, এটি পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের মতোই চট্টগ্রামের মানুষের জন্য অন্যতম প্রধান বিনোদন কেন্দ্র এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।