• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৯ পূর্বাহ্ন
Headline
বোয়ালখালী কধুরখীল জ্ঞানোদয় বিহারে প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসব পরিদর্শনে বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠী পটিয়ার আমির ভান্ডার দরবার শরীফে ওরশ, ঈদে মিলাদুন্নবী ও সেমা মাহফিল অনুষ্ঠিত কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা ও প্রবারণা পূর্ণিমায় বিপ্লব জলদাসের শুভেচ্ছা বোয়ালখালীতে প্রথমবারের মতো দাবা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত, অংশ নেন ৪০০ দাবাড়ু কোয়েপাড়া পল্লী সেবা সংঘের শিল্পীদের পরিবেশনায় রবীন্দ্রনাথের ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠী কর্তৃক শুভ প্রবারণা পূর্ণিমায় শুভেচ্ছা বার্তা  মা-ইলিশ রক্ষা নিষেধাজ্ঞা: সাগরে নামার আগেই ঋণের জালে আব্দুল মান্নান,নুরনবি সহ হালিশহরের অসংখ্য মৎস্যজীবীরা। বোয়ালখালীতে সমাজসেবায় অবদানের স্বীকৃতি, মুহাম্মদ হাসান চৌধুরীকে সম্মাননা স্মারক প্রদান বোয়ালখালীতে প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে সম্মাননা ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠিত 

জন্মাষ্টমী: শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব, মানবতার শিক্ষা ও ন্যায়ের পথে চলার আহ্বান

Reporter Name / ১৭৩ Time View
Update : শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পলাশ কান্তি নাথঃ

জন্মাষ্টমী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ভক্তরা গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও উৎসাহের মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালন করেন। শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শন শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়; তাঁর শিক্ষা সত্য, ন্যায়, প্রেম, মানবতা, কর্তব্য ও আত্মসংযমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই জন্মাষ্টমী শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং মানুষের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব

সনাতন ধর্মীয় শাস্ত্র ও পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, দ্বাপর যুগে পৃথিবীতে যখন অন্যায়, অত্যাচার ও অধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল, তখন ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের শাসনে সাধারণ মানুষ ছিল ভীত ও নির্যাতিত। কংস নিজের বোন দেবকীর সন্তানদের একে একে হত্যা করেন। এমন এক সংকটময় সময়ে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে, রোহিণী নক্ষত্রে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয় বলে ধর্মীয় বিশ্বাস।দেবকী ও বসুদেবের সন্তান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয় মথুরার কারাগারে। তাঁর জন্মের পর অলৌকিকভাবে কারাগারের দরজা খুলে যায় এবং বসুদেব তাঁকে নিরাপদে গোকুলে নন্দ ও যশোদার কাছে রেখে আসেন। গোকুল ও বৃন্দাবনে তাঁর শৈশব কাটে। শৈশব থেকেই তাঁর নানা লীলা ভক্তদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেয়।পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণ মথুরায় ফিরে কংসের অত্যাচারের অবসান ঘটান। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি অন্যায় ও অধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং মানুষের মধ্যে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছেন।

জন্মাষ্টমীর ধর্মীয় তাৎপর্য

জন্মাষ্টমীর মূল তাৎপর্য হলো—যখন সমাজে অন্যায় ও অধর্ম বৃদ্ধি পায়, তখন সত্য ও ন্যায়ের শক্তির আবির্ভাব অনিবার্য। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব সেই চিরন্তন সত্যের প্রতীক।শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা উচিত নয়। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য সাহস, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন। জন্মাষ্টমী সেই সাহস ও নৈতিক শক্তিকে জাগ্রত করার একটি সুযোগ।ভক্তরা এই দিনে উপবাস পালন করেন, শ্রীকৃষ্ণের পূজা ও আরাধনা করেন এবং তাঁর নামসংকীর্তন করেন। বিভিন্ন মন্দির ও আশ্রমে ভাগবত পাঠ, গীতাপাঠ, কীর্তন, ভজন, ধর্মীয় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মধ্যরাতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মলীলার স্মরণ ও পূজার মাধ্যমে অনেক স্থানে জন্মাষ্টমী উদযাপন করা হয়।

শ্রীকৃষ্ণের দর্শন ও কর্মের শিক্ষা

শ্রীকৃষ্ণের জীবনদর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো কর্তব্যনিষ্ঠা। মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে অর্জুন যখন আপনজনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বিষয় নিয়ে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে কর্তব্য ও কর্মের বিষয়ে শিক্ষা দেন। গীতার মাধ্যমে তিনি মানুষকে নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার আহ্বান জানান।শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্ম। মানুষের উচিত সৎভাবে নিজের কর্তব্য পালন করা। জীবনে সাফল্য বা ব্যর্থতা আসতেই পারে, কিন্তু দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়। এই শিক্ষা আজকের আধুনিক সমাজেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বর্তমান সময়ে মানুষ নানা ধরনের মানসিক চাপ, প্রতিযোগিতা, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রীকৃষ্ণের কর্মযোগের শিক্ষা মানুষকে নিজের দায়িত্বের প্রতি মনোযোগী হতে সাহায্য করতে পারে।প্রেম ও সম্প্রীতির প্রতীক শ্রীকৃষ্ণশ্রীকৃষ্ণের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রেম ও সম্প্রীতি। বৃন্দাবনের গোপ-গোপী, রাখাল বন্ধু এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম ভারতীয় আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণীয়।শ্রীকৃষ্ণের জীবন আমাদের শেখায় যে ভালোবাসা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে না; বরং মানুষকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসে। জাতি, বর্ণ, ধনী-দরিদ্র কিংবা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য ভুলে পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসার মাধ্যমে একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।বর্তমান সমাজে জন্মাষ্টমীর প্রাসঙ্গিকতাআজকের পৃথিবী প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও মানুষের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজন এখনো বিদ্যমান। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণে মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে। কোথাও ধর্মীয় বিদ্বেষ, কোথাও সামাজিক বৈষম্য, আবার কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।এই বাস্তবতায় জন্মাষ্টমীর শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে শেখায়। তিনি আমাদের শেখান, অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য দায়িত্বশীল হতে হবে।জন্মাষ্টমী উদযাপনের সময় আমাদের শুধু পূজা-অর্চনা করলেই চলবে না; শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্রকে সাহায্য করা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, দুর্বলকে রক্ষা করা এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করাও জন্মাষ্টমীর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে।

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি

বাংলাদেশ একটি বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির দেশ। এই দেশের ঐতিহ্য হলো পারস্পরিক সহাবস্থান, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য। প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান স্বাধীনভাবে পালন করার অধিকার রয়েছে। জন্মাষ্টমী তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলাদেশের সামগ্রিক অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতির সংস্কৃতিরও একটি অংশ।ধর্মীয় উৎসব মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য নয়; বরং মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। জন্মাষ্টমীর চেতনা যদি সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা আরও বৃদ্ধি পাবে।তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বানতরুণরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাই শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও দর্শন থেকে তরুণ প্রজন্মের অনেক কিছু শেখার আছে। আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, বুদ্ধিমত্তা, কৌশল, সাহস এবং দায়িত্ববোধ—শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে এসব গুণের সমন্বয় দেখা যায়।তরুণদের উচিত শুধু ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ উপভোগ না করে এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা উপলব্ধি করা। সত্যকে ভালোবাসা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, নিজের দায়িত্ব পালন করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

উৎসবের সৌন্দর্য ও সামাজিক দায়িত্ব

জন্মাষ্টমীর আনন্দ যেন সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। উৎসব পালনের পাশাপাশি অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো উচিত। মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যেতে পারে।পরিবেশের বিষয়টিও আমাদের মনে রাখতে হবে। প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার, শব্দদূষণ এবং পরিবেশের ক্ষতি করে এমন আয়োজন থেকে বিরত থেকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধবভাবে জন্মাষ্টমী পালন করা উচিত। ধর্মীয় উৎসবের সৌন্দর্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত হয়।জন্মাষ্টমী শুধু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্মরণে একটি উৎসব নয়; এটি সত্য, ন্যায়, প্রেম, মানবতা ও কর্তব্যের চেতনা জাগ্রত করার একটি মহৎ উপলক্ষ। শ্রীকৃষ্ণের জীবন আমাদের শেখায়—অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, সত্য ও ন্যায়ের পথ শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়।আজকের সমাজে জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে—অন্যায় নয়, ন্যায়ের পথে চলি; বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা ছড়াই; বিভেদ নয়, সম্প্রীতি গড়ে তুলি। শ্রীকৃষ্ণের আদর্শকে ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে ধারণ করতে পারলেই জন্মাষ্টমী উদযাপন সত্যিকার অর্থে সার্থক হবে।আসুন, এই পবিত্র জন্মাষ্টমীতে আমরা শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করি—আমাদের সমাজ থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যায় দূর হোক; প্রতিষ্ঠিত হোক সত্য, ন্যায়, শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা